

ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট:
বাগেরহাটের শরণখোলায় লোকালয়ে ঢুকে পড়া ৬ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি অজগর উদ্ধার করেছে বন বিভাগ, যা পরে বগী ফরেস্ট স্টেশন সংলগ্ন সুন্দরবনের গহীনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের অন্তর্গত বগী ফরেস্ট স্টেশন সংলগ্ন জনবসতিতে একটি অজগরের উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। গত ১৭ জুলাই শুক্রবার দুপুরে মঠবাড়ীয়া উপজেলার আমড়াগাছিয়া গ্রাম থেকে প্রায় ৬ ফুট দৈর্ঘ্যের এই অজগরটি উদ্ধার করে বন বিভাগের একটি দল। স্থানীয়রা অজগরটিকে লোকালয়ে দেখতে পেয়ে দ্রুত শরণখোলা রেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে বনরক্ষীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটিকে উদ্ধার করে বগী ফরেস্ট স্টেশনে নিয়ে আসেন। বন বিভাগের তথ্যমতে, অজগরটি সম্ভবত খাদ্যের সন্ধানে কিংবা বনের সীমানা পেরিয়ে পথ হারিয়ে লোকালয়ে চলে এসেছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, উদ্ধার পরবর্তী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে সাপটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বগী ফরেস্ট স্টেশন সংলগ্ন সুন্দরবনের গহীনে অবমুক্ত করা হয়েছে। এই ঘটনাটি বন্যপ্রাণী ও মানুষের সহাবস্থানের চ্যালেঞ্জকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে প্রায়শই বন্যপ্রাণীর অনুপ্রবেশ ঘটছে, যা জনজীবনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, লোকালয়ে সাপ বা অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর উপস্থিতি তাদের গবাদি পশু ও শিশুদের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলা এবং বর্ষাকালে বনের সীমানা পেরিয়ে লোকালয়ে আসা প্রাণীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। যদিও বন বিভাগ দ্রুত সাড়া দিয়ে সাপটিকে উদ্ধার করেছে, তবুও স্থানীয়দের মতে, বনের ভেতরে খাদ্যের অভাব বা আবাসস্থল সংকটের কারণেই প্রাণীরা এভাবে জনবসতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, বন বিভাগ যেন বনের ভেতরের পরিবেশ রক্ষায় আরও কঠোর নজরদারি বাড়ায় যাতে প্রাণীরা বনের গহীনেই অবস্থান করে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের বগী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার কাজী তামিল রসুল জানান, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর প্রবেশ রোধে বন বিভাগ সবসময়ই তৎপর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, উদ্ধারকৃত অজগরটি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল, যার কারণেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেটিকে তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে স্থানীয় জনসাধারণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে দেখা দিলে তা আঘাত না করে যেন অবিলম্বে বন বিভাগকে জানানো হয়। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা নিয়মিত টহল জোরদার করেছেন এবং বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ে আসা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে জনবল সংকট ও দুর্গম বনাঞ্চলের কারণে সব সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা সমাধান করতে তারা স্থানীয়দের সচেতনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এই অজগর উদ্ধারের ঘটনাটি সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী জনপদগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সংকটের একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলন মাত্র। ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন এবং বনের বাস্তুসংস্থানে মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য অশনিসংকেত বহন করছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বনের সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর এই অবাধ চলাচল বন্ধ করতে না পারলে এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
