ঢাকা
২০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৫:৩১
প্রকাশিত : আগস্ট ১৯, ২০২৬
আপডেট: আগস্ট ১৯, ২০২৬
প্রকাশিত : আগস্ট ১৯, ২০২৬

‎সুন্দরবনে অবমুক্ত বাঘিনীর রহস্যময় অন্তর্ধান: ৪০টি ক্যামেরায় মিলছে না অস্তিত্ব


‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ

‎শিকারিদের ফাঁদ থেকে উদ্ধার ও দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ অবস্থায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করা বাঘিনীটি এক মাস পেরিয়ে গেলেও ট্র্যাপিং ক্যামেরায় ধরা না পড়ায় তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা ও ধোঁয়াশা।

‎সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক এলাকায় শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হওয়ার পর দীর্ঘ ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে গত ১২ জুলাই যে বাঘিনীটিকে বন্য পরিবেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, এক মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বন বিভাগ বাঘিনীটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ওই এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী শ্যালনদীর পূর্বপাড় ও জয়মনি এলাকা জুড়ে প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাপিং ক্যামেরা বসিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এতগুলো ক্যামেরার কোনোটিতেই বাঘিনীটির অস্তিত্ব বা চলাচলের কোনো ফুটেজ ধরা পড়েনি। দীর্ঘ সময় খাঁচাবন্দি ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বাঘিনীটি বন্য পরিবেশে নিজেকে কতটা মানিয়ে নিতে পেরেছে এবং সে আদৌ জীবিত আছে কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাঘিনীটির অবমুক্তির সময়কার শারীরিক দুর্বলতা ও ভারসাম্যহীনতা তার টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে, যা পুরো বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

‎ভুক্তভোগী বাঘিনীটির এই অন্তর্ধানের পেছনে বনের বর্তমান পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং শিকারিদের তৎপরতাকেও বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অবমুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, খাঁচা থেকে বের হওয়ার সময় বাঘিনীটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে এবং বারবার পেছনের দিকে তাকাচ্ছে, যা তার মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে বন বিভাগ দাবি করছে, অবমুক্তির পর ১৫০ মিটার এলাকা জুড়ে বাঘিনীটির পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছিল, যা তার প্রাথমিক বেঁচে থাকার প্রমাণ দেয়। তবে বর্তমানে সেই একই এলাকায় অন্য তিনটি বাঘিনীর বিচরণ রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই বাঘিনীটির জন্য একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় মানুষের সংস্পর্শে থাকার পর বন্য পরিবেশে ফিরে আসা একটি বাঘের জন্য অন্য বাঘের আধিপত্য বজায় থাকা এলাকায় টিকে থাকা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, যেখানে তার পুনরায় কোনো শিকারি বা চোরাকারবারির ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

‎বন বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বাঘিনীটি মারা যায়নি বরং অন্য এলাকায় সরে গেছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, একটি বাঘ সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করে থাকে, ফলে বাঘিনীটি তার নিজের এলাকা পরিবর্তন করে ক্যামেরার আওতার বাইরে চলে যেতে পারে। বন বিভাগ আগামী সপ্তাহে আবারও এই ৪০টি ট্র্যাপিং ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করবে এবং এলাকাটিতে নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে। যদিও বন কর্মকর্তাদের এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না সচেতন মহল। চিকিৎসাধীন বাঘিনীটিকে এমন একটি এলাকায় অবমুক্ত করা হয়েছে যেখানে অন্য বাঘের উপস্থিতি আগেই নিশ্চিত ছিল, যা তার টিকে থাকার সম্ভাবনাকে আরও সংকীর্ণ করে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে বাঘিনীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগের কৌশলগত ত্রুটি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

‎পরিশেষে, সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ইকোসিস্টেমে উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া যে কতটা জটিল, এই ঘটনাটি তারই একটি বড় উদাহরণ। বাঘিনীটির এই রহস্যময় অন্তর্ধান কেবল একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার লড়াই নয়, বরং সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের কার্যকারিতা ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতার দিকেও ইঙ্গিত করে। যদি বাঘিনীটি জীবিত থেকে থাকে, তবে তার পরবর্তী অবস্থান নিশ্চিত করা এবং তাকে নিরাপদ করিডোরে ফিরিয়ে আনা বন বিভাগের জন্য এখন বড় পরীক্ষা। অন্যদিকে, যদি সে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকে, তবে তা সুন্দরবনের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ছিদ্র থাকারই প্রমাণ দেয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও বনজ সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর জন্য এই ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণ অনিবার্য করে তুলেছে।

সর্বশেষ
প্রকাশক ও সম্পাদক - সিকদার সাদেকুর রহমান
বার্তা সম্পাদক- জাহিদুল হাসান জাহিদ
কার্যালয়ঃ ৪ দারুসসালাম রোড, মিরপুর, ঢাকা।
aazkaalbangla@gmail.com
মোবাইলঃ +8801842280000
আজকাল বাংলা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2021-2025 AjkalBangla.Com All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram