

রমজান মাস এলেই মুসলমানদের জীবনে এক ধরনের নীরব পরিবর্তন শুরু হয়। দিনের রুটিন বদলে যায়, খাবারের সময় বদলে যায়, বদলে যায় আচরণও। কিন্তু রোজা শুধু না খেয়ে থাকার নাম নয়। এর ভেতরে আছে গভীর আত্মিক শিক্ষা, যা আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ভোগবাদ আর মানসিক চাপের ভিড়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
রোজার মূল শিক্ষা সংযম। খাওয়া, পান করা ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই রোজার প্রথম ধাপ। কোরআনে আল্লাহ বলেন
“হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৩)
এই তাকওয়া বা আত্মসচেতনতা শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়; এটি মানুষের চিন্তা ও আচরণকে শৃঙ্খলিত করে। আধুনিক জীবনে আমরা অভ্যস্ত তাৎক্ষণিক চাওয়া পূরণে। ক্ষুধা লাগলে সঙ্গে সঙ্গে খাবার, বিরক্ত লাগলে স্ক্রল, মন খারাপ হলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা। রোজা আমাদের শেখায় অপেক্ষা করতে, থামতে, নিজের ইচ্ছার ওপর কর্তৃত্ব রাখতে। এই থামতে পারার ক্ষমতাই আত্মশুদ্ধির পথ খুলে দেয়।
রোজার একটি বড় আত্মিক দিক হলো ব্যক্তিগত সততার চর্চা। রোজা এমন একটি ইবাদত, যা অনেকটাই গোপন। কেউ চাইলে লোকচক্ষুর আড়ালে রোজা ভাঙতে পারে, কিন্তু সে করে না। এই নিজেকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস মানুষের চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন
“রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া না করে।” (বুখারি ও মুসলিম)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রোজা শুধু পেটের ইবাদত নয়; এটি জিহ্বা, আচরণ ও মনোভাবেরও ইবাদত। আধুনিক সমাজে যেখানে রাগ, তর্ক ও অসহিষ্ণুতা বেড়েই চলেছে, সেখানে রোজার এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
রোজা মানুষকে সহানুভূতিশীল করে তোলে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতা মানুষকে অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। যারা প্রতিদিন অভাবের মধ্যে দিন কাটায়, রোজার সময় তাদের বাস্তবতা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। এ কারণেই রমজান মাসে দান-সদকা ও যাকাতের গুরুত্ব বেড়ে যায়। কোরআনে বলা হয়েছে
“তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, আল্লাহ অবশ্যই তা জানেন।” (সুরা আল-বাকারা: ২৭৩)
এই আয়াত মানুষকে দানের ক্ষেত্রে আন্তরিক হতে উৎসাহ দেয়। আধুনিক জীবনে যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও আত্মকেন্দ্রিক সাফল্যের ধারণা শক্তিশালী, সেখানে রোজা মানুষকে আবার সমাজমুখী করে তোলে।
মানসিক দিক থেকেও রোজার প্রভাব গভীর। আধুনিক জীবন মানেই চাপ, উদ্বেগ আর অস্থিরতা। কাজের চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন মানুষের মনকে ক্লান্ত করে তোলে। রোজার সময় নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়। এই আত্মসংযোগ মানসিক প্রশান্তি আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (বুখারি)
এই হাদিস রোজাকে শুধু কষ্টের অনুশীলন নয়, বরং আত্মিক মুক্তির একটি সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে। অনেকেই লক্ষ্য করেন, রমজানে তাদের ধৈর্য বাড়ে, রাগ কমে, মন কিছুটা হলেও স্থির থাকে। এটি রোজার আত্মিক অনুশীলনেরই ফল।
তবে আধুনিক জীবনে রোজার চর্চা সহজ নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট, শারীরিক পরিশ্রম ও স্ক্রিননির্ভর জীবন রোজাকে অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জ করে তোলে। এখানেই রোজার প্রকৃত শিক্ষা আরও স্পষ্ট হয়। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভারসাম্য রাখা, ক্লান্তির মধ্যেও শালীনতা বজায় রাখা, ক্ষুধার মধ্যেও অন্যের প্রতি সদাচরণ করা।এসবই রোজার বাস্তব প্রয়োগ।
আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে রোজার একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে। রমজান এলেই অতিরিক্ত কেনাকাটা, বাহারি ইফতার ও খাবারের অপচয় বেড়ে যায়। অথচ রোজার মূল শিক্ষা সংযম ও সরলতা। এই দ্বন্দ্ব আমাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় আমরা কি রোজার আত্মিক চেতনাকে ধারণ করছি, নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় আটকে যাচ্ছি।
সবশেষে বলা যায়, রোজা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। আত্মসংযম, সততা, সহমর্মিতা ও ধৈর্যের যে শিক্ষা রোজা দেয়, তা আধুনিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রয়োগ করা সম্ভব। যদি রমজান শেষে এই শিক্ষার কিছুটা হলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে থেকে যায়, তাহলেই রোজা একটি মাসের ইবাদতের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বছরের জন্য নৈতিক পথনির্দেশ হয়ে উঠতে পারে।
রমজানের সাফল্য সেখানেই যেখানে রোজা আমাদের ক্ষুধার অভিজ্ঞতার বাইরে নিয়ে গিয়ে আরও সংবেদনশীল, সংযত ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
তৌসিফ রেজা আশরাফী
লেখক ও শিক্ষার্থী
সৈয়দপুর, নীলফামারী
বি.এ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)
