

মো. নজরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ।।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের শ্যামনগর, সাতক্ষীরায়
কাজের একঘেয়েমি আর পেশাগত ব্যস্ততা দূরে ঠেলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো একটি দিন কীভাবে দলের বন্ধনকে দৃঢ় করতে পারে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল সাতক্ষীরার শ্যামনগর।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা ‘বারসিক’-এর মানিকগঞ্জ সমতল অঞ্চল এবং শ্যামনগর আঞ্চলিক টিমের সহকর্মীদের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো এক অনন্য কর্পোরেট রিফ্রেশমেন্ট ট্যুর।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘আকাশলীনা’ ও ‘কলাগাছিয়া’ ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রে দিনভর এই ভ্রমণ যেন সহকর্মীদের কাজের ক্লান্তি দূর করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও টীম বন্ডিং (Team Bonding)-এর নতুন বার্তা দিয়ে গেল।
প্রকৃতির মাঝে প্রভাতী সূচনা ও কেওড়া রূপকথা
দিনের শুরুতেই আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র সংলগ্ন ‘বারসিক শ্যামনগর রিসোর্স সেন্টারে’ মানিকগঞ্জ ও শ্যামনগর টিমের সদস্যরা একত্রিত হন। সবুজ প্রকৃতির মাঝে সবাই মিলে সকালের নাস্তা সারার পর ইকো ট্যুরিজম টিমের উষ্ণ অভ্যর্থনায় শুরু হয় মূল পর্ব।
স্থানীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ‘মধুপানি’ দিয়ে আপ্যায়নের পাশাপাশি ইকো ট্যুরিজম গাইডদের কাছ থেকে বন ভ্রমণের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জেনে নেন কর্মীরা।
চুনা ও মালঞ্চ নদীর স্নিগ্ধ বাতাস আর ম্যানগ্রোভ বনের সবুজ পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দলের মধ্য থেকে শহরের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
ঝুলন্ত সেতু, ট্রেইল ওয়াক ও প্যানোরামিক ক্যানভাস
আকাশলীনার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর দীর্ঘ কাঠের ট্রেইল ও নান্দনিক ঝুলন্ত সেতু। সহকর্মীরা সবাই দল বেঁধে কাঠের ট্রেইল ধরে বনের ভেতরে হাঁটার সময় সুন্দরবনের বৈচিত্র্যময় ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর আকাশলীনার উঁচু ওয়াচ টাওয়ারে চড়ে উপভোগ করা যায় চারপাশের এক অপরূপ প্যানোরামিক দৃশ্য। সহকর্মীদের উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণ, গ্রুপ ছবি আর সেলফি সেশনের মাধ্যমে স্থানটি যেন মুহূর্তেই এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়।
নদীর বুকে জলকাব্য: মালঞ্চ পেরিয়ে কলাগাছিয়া
দুপুরের কড়া রোদ নামার আগেই শুরু হয় অভিযানের দ্বিতীয় অংশ। ট্রলারে চড়ে নদীর বুকে ভেসে কলাগাছিয়া ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা।
রূপসী মালঞ্চ নদীর বুক চিরে ছুটে চলা ট্রলারের ছাদে বসে সহকর্মীদের খালি গলায় গান, আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টায় ভ্রমণের আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়।
কলাগাছিয়ায় নামতেই দেখা মেলে সুন্দরবনের মায়াবী হরিণ ও চঞ্চল বানরের দল। বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করেই হরিণকে কেওড়া পাতা দেওয়া কিংবা বানরকে খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকেন পর্যটক কর্মীরা। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মকে সম্মান জানিয়ে বন্যপ্রাণীর এমন কাছাকাছি অবস্থান দলের সবার জন্যই ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও রাতের সুরের ঝঙ্কার
বিকেলের ঢলে পড়া আলোয় সফরসঙ্গীরা পৌঁছান দাতিনাখালী মুণ্ডা পাড়ায়। সেখানে আদিবাসী মুণ্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘কারাম পূজা’ দর্শন করেন তারা। আদিবাসী নারীনেত্রী আনন্দিতা মুণ্ডার মুখে তাঁদের ঐতিহ্য ও জীবনসংগ্রামের গল্প শুনে এক ভিন্নধর্মী অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
দিনভর নদী আর বনের রূপ উপভোগ শেষে সন্ধ্যায় সবাই ফিরে আসেন বারসিক রিসোর্স সেন্টারে। সুস্বাদু নৈশভোজের পর রাতের শান্ত পরিবেশে বসে খালি গলায় গানের আসর। একে একে সহকর্মীদের কণ্ঠের গান ও খোলামেলা আড্ডায় রিসোর্স সেন্টার প্রাঙ্গণে নেমে আসে আনন্দের জোয়ার।
পরিশেষে
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি মানিকগঞ্জ ও শ্যামনগর টিমের কর্মীদের মধ্যকার এই আনন্দভ্রমণ পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও এক আত্মিক টান তৈরি করেছে। ম্যানগ্রোভের সবুজ স্মৃতি আর সহকর্মীদের হাঁসির কলতান বুকে নিয়ে এক নতুন শক্তি ও উদ্যম নিয়ে কাজে ফেরার বার্তা দিয়ে শেষ হয় স্মরণীয় এই পথচলা।
